গান ভেঙে গান

বরোদার মহারাজা সয়াজিরাও গায়কোয়াড় ছিলেন নির্ভিক, দৃঢ়চেতা ও অভিজাত ব্যক্তিত্বের মানুষ। দিল্লীর দরবারে অন্যান্য দেশীয় রাজারা যখন নতজানু হয়ে সেলাম জানান, গায়কোয়াড় তখন লর্ড কার্জনের সঙ্গে করমর্দন করে দেশবাসীর শ্রদ্ধা অর্জন করেছিলেন। বাঙালিদের উপরে গায়কোয়াড়ের বিশেষ দুর্বলতা ছিল। প্রখ্যাত উপন্যাসিক এবং ভারতের দ্বিতীয় ICS (প্রথমজন সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর) শ্রী রমেশচন্দ্র দত্তকে (১৮৪৮-১৯০৯) বরোদার মন্ত্রীত্ব পদে নিয়োগ করেছিলেন। কালক্রমে নিজের যোগ্যতাবলে রমেশচন্দ্র সেখানকার সর্বোচ্চ প্রশাসনিক দায়িত্ব লাভ করেছিলেন। আর একজন কৃতি বাঙালি শ্রী অরবিন্দ ঘোষকেও তিনি বরদা কলেজের উপাধ্যক্ষ পদে নিয়োগ করেছিলেন।

মহারাজা সয়াজিরাও গায়কোয়াড়

গায়কোয়াড়ের অসামান্য বাঙালি-প্রীতির জন্য সমস্ত বাঙালি সমাজ তাঁর কাছে কৃতজ্ঞ ছিলেন। ১৯০৪ সালের নভেম্বর মাসে সয়াজিরাও গায়কোয়াড় সস্ত্রীক কলকাতা ভ্রমণে এসেছিলেন। সেই সময়ে তাঁকে সংবর্ধনা জানানোর জন্য নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে পার্কস্ট্রীটের ‘বেঙ্গল ল্যাণ্ড হোল্ডার্স অ্যাসোসিয়েশনে‘ নভেম্বর মাসের ৯ তারিখে এক বিশাল সংবর্ধনার আয়োজন করা হয়েছিল। আশুতোষ চৌধুরী, নাটোরের মহারাজা ও কিছু বিশিষ্ট ব্যক্তি ছিলেন অনুষ্ঠানের মূল আয়োজক। রবীন্দ্রনাথ তখন বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতি জগতের উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব। একের পর এক সৃষ্টি করে চলেছেন উপন্যাস, নাটক, গান কবিতা ইত্যাদি। তাঁর লেখা গানগুলি ইতিমধ্যেই অসম্ভব জনপ্রিয়, সর্বপোরি তিনি নিজে একজন সুকন্ঠি গায়ক। সংবর্ধনার উদ্যোক্তারা মহারাজের সম্মানার্থে একটি গান রচনা করে অনুষ্ঠানে গাইবার জন্য রবীন্দ্রনাথকে অনুরোধ জানিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ গায়কোয়াড়ের ব্যক্তিত্বে মুগ্ধ ও তাঁর বিশেষ অনুরাগী ছিলেন। অনুরোধ গ্রহণ করে তিনি ‘বঙ্গজননী-মন্দিরাঙ্গন মঙ্গলোজ্জ্বল’ গানটি রচনা করেছিলেন। পিতা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের অসুস্ততার জন্য নিজে ওই অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে না পারলেও রবীন্দ্রনাথ গানটিতে সুর (ভূপালি-তেওড়া) দিয়ে অন্যান্য গায়কদের শিখিয়ে দিয়েছিলেন। পরবর্তীকালে এই গানের পাঠ পরিবর্তন করে তিনি আরও তিনটি গান রচনা করেছেন। যদিও ‘বঙ্গজননী-মন্দিরাঙ্গন মঙ্গলোজ্জ্বল’ গানটি গীতবিতানে সংকলিত হয়নি।

রবীন্দ্রনাথ দেশবিদেশের বিভিন্ন গানের কথা, সুর কিম্বা ভাব অবলম্বন করে অসংখ্য গান রচনা করেছেন। সেগুলি ‘ভাঙাগান‘ হিসাবে পরিচিত। আবার নানা সময়ে নিজের লেখা কবিতাকে গানে অথবা গানকে কবিতায় রূপান্তর করা তাঁর সৃষ্টির অন্যতম বৈশিষ্ঠ। বিভিন্ন নাটকের মঞ্চায়ন, বর্ষামঙ্গলের অনুষ্ঠান, নানাজনের অনুরোধে কিম্বা নিছক নিজের খেয়ালে রবীন্দ্রনাথ গান-কবিতার এই পরিবর্তন ঘটিয়েছিলেন। সংখ্যাটা নেহাত কম নয় (প্রায় ১০৬টি)। এমনকি বেশ কয়েকটি কবিতা থেকে নতুন কবিতা সৃষ্টির উদাহরণও রয়েছে। কিন্তু নিজের লেখা গান ভেঙে নতুন গান রচনার ঘটনা খুবই নগণ্য।

১৯০৪ সালে লেখা বঙ্গজননী-মন্দিরাঙ্গন মঙ্গলোজ্জ্বল গান ভেঙে রবীন্দ্রনাথ যে তিনটি গান রচনা করেছেন তার প্রতিটির ক্ষেত্রেই নির্দিষ্ট উপলক্ষ বা তাগিদ ছিল।

মাতৃমন্দির-পুণ্য-অঙ্গন কর’ মহোজ্জ্বল (১৯১৭)

রবীন্দ্রনাথের দীর্ঘদিনের বন্ধু ও শুভাকাঙ্ক্ষী জগদীশচন্দ্র বসুর জন্মদিন ১৮৫৮ সালের ৩০ নভেম্বর। ১৯১৬ সালে গবেষণার কাজে তিনি তখন রয়েছেন আমেরিকায়। কিন্তু মন পড়ে রয়েছে কলকাতায় যেখানে একটু একটু করে গড়ে উঠছে তাঁর স্বপ্নের গবেষণাগার, বসু-বিজ্ঞান মন্দির। একই সময়ে রবীন্দ্রনাথ আমেরিকার পরিভ্রমণ-রত। জগদীশচন্দ্রের ইচ্ছ তাঁর আটান্নতম জন্মদিনেই বিজ্ঞানমন্দিরের শুভ উদ্বোধন হবে। আর সেই উপলক্ষে একটা আশীর্বাদী গান লিখে দেবার জন্য তিনি অনুরোধ জানালেন রবীন্দ্রনাথকে। নানা সময়ে নানা উপলক্ষে বহু অনুরোধের গান রচনা করলেও, এবার অত্যন্ত ব্যস্ততার জন্য রবীন্দ্রনাথ জগদীশচন্দ্রের অনুরোধ রাখবার সময় পেলেন না। তবে সেটা পুষিয়ে দিয়েছিলেন পরের বছর। কারণ ১৯১৬ সালে বিজ্ঞানমন্দিরের কাজ শেষ না হওয়ায় উদ্বোধনের দিন স্থির হয়েছিল ১৯১৭ সালের ৩০ নভেম্বর।

মন্দিরের দ্বারোদ্ঘাটন উপলক্ষে এবার রবীন্দ্রনাথ ১৯০৪ সালের  পুরোনো গানটি ভেঙে ‘মাতৃমন্দির পুণ্যঅঙ্গন করো মহোজ্জ্বল’ গানটি লিখে পাঠালান। সেটি ‘আবাহন’ শিরোনাম দিয়ে অনুষ্ঠানপত্রীতে ছাপা হয়েছিল। এবারেও রবীন্দ্রনাথ প্রিয় বন্ধুর জীবনের অন্যতম কাজের সাক্ষী হিসাবে উপস্থিত ছিলেন না। কারণ আগের দিনই শরীর খারাপের অজুহাতে তিনি কলকাতা ছেড়ে শান্তিনিকেতনে চলে যান। অবশ্য ক্ষিতিমোহন সেনকে অনুরোধ করেছিলেন উদ্বোধন উপলক্ষে কিছু বৈদিকমন্ত্র পড়তে।  জগদীশচন্দ্র বসুর সারা জীবনের সঞ্চয় এবং নানাজনের অনুদানে নির্মিত এই মন্দিরটি অলংকরণ করেছিলেন নন্দলাল বসু, সুরেন্দ্রনাথ কর প্রমুখ শিল্পীরা।

স্বরূপ পাল

এটা ভেবে আশ্চর্য হতে হয় যে, প্রগাঢ় বন্ধুত্ব সত্ত্বেও জগদীশচন্দ্রের জন্য রবীন্দ্রনাথ একটি নতুন গান রচনার সময় পেলেন না! কিম্বা অনুষ্ঠানে উপস্থিতও থাকলেন না! আসলে সেই সময়ে জগদীশচন্দ্রের স্ত্রী অমলা বসুর কিছু কার্যকলাপের জন্য রবীন্দ্রনাথ এবং বসু পরিবারের মধ্যে এক তিক্ততার সৃষ্টি হয়েছিল। সম্ভবত অমলা বসুর সাক্ষাৎ এড়াবার জন্যই রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনে পালিয়ে গিয়েছিলেন।

শান্তিমন্দির পুণ্য অঙ্গন (১৯২৫)

বঙ্গজননী মন্দিরাঙ্গন মঙ্গলোজ্বল কর হে গানটি দ্বিতীয়বার ভাঙা হয়েছিল ১৯২৫ সালে। ১৯২৪ এর য়ুরোপ ভ্রমণের সময়ে ইটালিতে ক্লান্ত রবীন্দ্রনাথকে জনজোয়ার থেকে আগলিয়ে রেখেছিলেন রোম বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃতের অধ্যাপক  কার্লো ফার্মিকি (১৮৭১-১৯৪৩)। তিনি একজন প্রসিদ্ধ ভারততত্ত্ববিদ।রবীন্দ্রনাথের য়ুরোপ ভ্রমণের সময়ে তিনি স্বেচ্ছায় দোভাষীর ভূমিকাও পালন করেছিলেন। তাঁর পাণ্ডিত্যে মুগ্ধ হয়ে রবীন্দ্রনাথ অনুরোধ করেছিলেন বিশ্বভারতীতে অতিথি অধ্যাপক হিসাবে যোগ দিতে। ফার্মিকির বহুদিনের ইচ্ছা ছিল ভারতবর্ষকে দেখবার, জানবার। রবীন্দ্রনাথের আহ্বানে তাঁর সেই স্বপ্ন সফল হয়েছিল। ১৯২৫ সালের ২১ নভেম্বর তিনি শান্তিনিকেতনে এসে পৌঁছান। আশ্রমের রীতি অনুযায়ী, রবীন্দ্রনাথের উপস্থিতিতে আশ্রমবাসী ও ছাত্রছাত্রীরা আম্রকুঞ্জে তাঁকে মাল্যচন্দন আর শঙ্খধ্বনি দিয়ে বরণ করে নেন। প্রত্যুতরে কার্লো বলেন,‘আমি সমগ্র ইতালির সম্ভাষণ এবং শুভকামনা বহন করিয়া তোমাদের কাছে আসিয়াছি। ইতালি ও ভারতবর্ষের মধ্যে এইবার আন্তরিক-যোগ সাধন করিবার সময় আসিয়াছে’। এই উপলক্ষে রবীন্দ্রনাথ শান্তিমন্দির পুণ্য অঙ্গন গানটি রচনা করে ওই অনুষ্ঠানে গেয়েছিলেন। যদিও গানটি গীতবিতানে সংকলিত হয়নি।

কার্লো ফার্মিকি

বিশ্ববিদ্যাতীর্থ প্রাঙ্গন কর’ মহোজ্জ্বল (১৯৩৯)               

১৩৪৭ সালের ২২ শ্রাবণ। কবির মৃত্যর ঠিক এক বছর আগের কথা। শান্তিনিকেতনে সিংহসদন সেজে উঠেছে আলপনা, ফুল আর রঙিন চাদরে, যেমনটা হয়ে থাকে শান্তিনিকেতনের যেকোনো মাঙ্গলিক অনুষ্ঠানে। আশ্রমিকদের মহা উৎসাহ। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিরা আসছেন রবীন্দ্রনাথকে সাম্মানিক সাহিত্যাচার্য উপাধিতে ভূষিত করতে। প্রস্তুতি চলছে রবীন্দ্রনাথের প্রত্যভিভাষণের যেটি লেখা হবে সংস্কৃততে।কারণ রীতি অনুযায়ী অক্সফোর্ড-মানপত্রের ভাষা লাতিন। অনুষ্ঠানের দিন সিংহসদন উপচে পড়েছে আশ্রমবাসী, শিক্ষক, ছাত্রছাত্রী আর শান্তিনিকেতনের মানুষে। তারা আবেগ ধরে রাখতে পারছেন না তাদের প্রিয় কবির এই বিশ্ব-স্বীকৃতিতে। যথা সময়ে সমাবর্তন উৎসব শুরু হল। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে এসেছেন স্যার মরিস গ্যয়ার, সর্বেপল্লী রাধাকৃষ্ণন ও অন্যান্য আধিকারিকেরা। চন্দনমাল্য, মন্ত্রোচ্চারণ ও শঙ্খধ্বনির সঙ্গে অতিথিদের বরণ করে নেবার পরে কবিগুরুকে উত্তরীয় ও মানপত্র সহ ডক্টর অব লিটারেচার বা সাহিত্যাচার্য উপাধি দিয়ে সম্মানিত করা হল। এই উপলক্ষে রবীন্দ্রনাথ ১৯০৪ সালের লেখা গানটি ভেঙে বিশ্ববিদ্যাতীর্থপ্রাঙ্গণ কর মহোজ্বল গানটি রচনা করেছেন।  

সুনন্দা ঘোষ

রবীন্দ্রনাথের সুবিশাল সৃষ্টির ভাণ্ডারে নিজের গান ভেঙে একাধিক গান রচনার ঘটনা খুবই বিরল। কিন্তু উপরের যেকটি অনুষ্ঠান উপলক্ষে তিনি গানগুলি নির্মান করেছেন, তার প্রতিটিই যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ । প্রশ্ন জাগে এক্ষেত্রে তিনি কেন মৌলিক গান রচনা করলেন না?

6 Responses

  1. একই গান থেকে বিভিন্ন কয়েকটি অনুষ্ঠানের জন্য কবিগুরু একাধিক গান রচনা করেছেন এমন দৃষ্টান্ত মনে হয় খুব একটা নেই।তবে একদম প্রথম গানটির কথা যা গীতবিতানে সংকলিত নেই, ব্লগে আজকের লেখাটি থেকে প্রথম জানতে পারলাম।
    অনেক ধন্যবাদ শ্রদ্ধেয় মানুষটিকে যিনি তাঁর কর্মজীবনের অতো ব্যস্ততার মধ্যেও রবীন্দ্রনাথের
    সৃষ্টি এবং তার নানা জানা অজানা অধ্যায়ের কথা এত সহজ এবং সুন্দরভাবে পরিবেশন করে পাঠককুলকে সমৃদ্ধ করে গিয়েছেন।

  2. Amitabha sarkaarer sange ami akmat. Rabindranath samparke ato tathyo Dr Sarkar ato upadeo bhabe samne nie aschhen jar janyo antorikbhabe mugdho o kritango.
    Aj sarbobyapi abakshayer madhye je hategona kayekjan ullekhjogyo kaj kore jachhen Purnendu babu tander madhye anyatama.
    Ei bishal karmokando akak byaktir pakshe kibhabe sambhab ,tao peshagato satataa bajay rekhe onake na dekhle bujhtamna.
    Apni sustho thakun.kichhudin apner lekha theke bonchito thakbo bole jamon akshep hochhe temni sthir jani aro beshi kichhu pabo.

  3. অনেক অজানা তথ‍্য জেনে কৃতার্থ হচ্ছি,
    আবার জানা তথ‍্য আপনার পরিবেশনার গুণে যেন নতুন করে জানছি। ধন‍্যবাদ আপনাকে।

  4. এত নতুন নতুন তথ্য উন্মোচিত হচ্ছে আমাদের কাছে আপনার গবেষণার জন্য। আমরা ধন্য। নবরূপে সজ্জিত হয়ে যার প্রকাশ ঘটতে চলেছে, তার প্রতীক্ষায় দিন গুণবো।

  5. কত কি জানলাম। ভাঙা গানের পাশাপাশি নিজের গানের পুনর্নির্মাণ রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিসুখ উল্লাসের এক অতুলনীয় দৃষ্টান্ত। বড় সুন্দরভাবে ও তথ্যসহকারে পুরো বিষয়টি বর্ণিত হয়েছে এখানে। সঙ্গে গানের ব্যবহার সুপ্রযুক্ত। ‘শনিবারের ব্লগ’ আবার শুরুর অপেক্ষায় থাকবো।

  6. সত্যি, স্যার। এত কিছু জানতে পারি আপনার লেখা থেকে। অশেষ ধন্যবাদ।

Leave a Reply to ANIRUDDHA DE Cancel reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *