গীতবিতান তথ্যভাণ্ডার প্রসঙ্গে

রবীন্দ্রনাথ ৩৪ বছর বয়সে শিলাইদহে থাকাকালীন লিখেছিলেন প্রেম পর্যায়ের একটি গান। সেটির স্বরলিপি করেন দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর। প্রথম রেকর্ড করেন পূর্ণকুমারী জেনোফোন রেকর্ড থেকে। গানটি রচনার ২৫ বছের পরে নিউ ইয়র্কে হেলেন কেলারের সঙ্গে সাক্ষাতের সময়ে রবীন্দ্রনাথ তাকে গানটি গেয়ে শোনানা। আবার সত্যজিৎ রায়ের ‘চারুলতা’ ছায়াছবিতে গানটি ব্যবহৃত হয়েছে। কোন গান? আমি চিনি গো চিনি তোমারে।

এমনই ভাবে গীতবিতানের সব গানের সমস্ত তথ্য এক্ত্র করা হয়েছে পূর্ণেন্দুবিকাশ সংকলিত ও সম্পাদিত গীতবিতান তথ্যভাণ্ডার (সিগনেট প্রেস) বইতে। বছর দশেক আগে গীতবিতান আর্কাইভ নামে একটি ডিভিডি প্রকাশ করে আমাদের চমৎকৃত করেছিলেন ডাক্তার পূর্ণেন্দুবিকাশ সরকার’। শুভেচ্ছা বার্তায় লিখেছেন শঙ্খ ঘোষ, ‘সেই একই অতন্দ্র নিষ্টা আর শ্রমে এবার তিনি মুদ্রিত আকাকে আমাদের উফার দিয়েছেন এই গীতবিতান তথ্যভাণ্ডার, রবীন্দ্রনাথের গানের প্রসঙ্গে জ্ঞাতব্য সমস্ত রকম তথ্য দিয়ে

গীতবিতান তথ্যভাণ্ডারের বৈশিষ্ট তার বিন্যাসে। বইটির দুটি পাতা খুললেই যেকোন গানের সমস্ত তথ্য একনজরে দেখে নেওয়া  যায়। প্রতিটি গানের তথ্য বইটির বামদিক ও ডানদিকের পৃষ্ঠার সারনীর মধ্যে ধরা রয়েছে।

বামদিকের পৃষ্ঠা থেকে আমরা সহজেই জেনে নিতে পারি গানের বিভাগ, উপবিভাগ, উৎসগ্রন্থ, ক্রমিক সংখ্যা, রচনাস্থান, কবির বয়স, রচনাকাল, স্বরবিতান সংখ্যা, স্বরলিপিকার এবং গানের রাগ সুর ও তালের সমস্ত তথ্য।

ডানদিকের পৃষ্ঠায় পাওয়া যাবে  পূর্বতন স্বরলিপি নির্দেশ, পাঠান্তরিত গান, পাণ্ডুলিপি সংখ্যা ও নির্দেশ, বিভিন্ন মাঘোৎসব, বর্ষামঙ্গল সহ নানা অনুষ্ঠানে ব্যবহৃত রবীন্দ্রসঙ্গীত। আর রয়েছে ভাঙাগান, সিনেমায় ব্যবহৃত গান, রবীন্দ্র-জীবৎকালে প্রথম রেকর্ড, নাটক, গীতিনাট্য, নৃত্যনাট্যে ব্যবহৃত গান ও সেগুলির দৃশ্য-সংখ্যা, চরিত্রাভিনেতার নির্দেশ ও নাটকের বিভিন্ন মঞ্চায়নের তথ্য।

এছাড়াও রয়েছে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত (প্রকাশকালসহ) গান, গান-কবিতার রূপান্তর প্রক্রিয়া, রবীন্দ্রনাথের নিজের ইংরাজিতে অনুবাদ করা ২৫১ টি গানের প্রথম লাইন ও গ্রন্থ-নির্দেশ, ইংরাজি গীতাঞ্জলির গান ইত্যাদি অসংখ্য খবর।

কত বিচিত্র তথ্য এই ভাণ্ডারে। রবীন্দ্রনাথের আলোচিত ১২১৯টি গানের মধ্যে ৮৩৩টি গানের রচনাস্থান জানা যায়না। বোলপুর ও সুরুল সহ শান্তিনিকেতনে লেখা হয়েছে প্রায় ৬০০টি গান, শিলাইদহে ১০৬টি, বিদেশের মাটিতে লখেছেন ৫৪টি গান। মোট ২৪ জন স্বরলিপিকারের মধ্যে সবচেয়ে বেশী স্বরলিপি তৈরি করেছেন দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর। এর পরেই ইন্দিরা দেবী। রবীন্দ্রনাথ-কৃত স্বরলিপি মাত্র ১টি (এ কি সত্য সকলই সত্য)। প্রথম দিকের রেকর্ড লেবেলে গান রচয়িতা হিসাবে রবীন্দ্রনাথের মান থাকত না।  রবীন্দ্রনাথ নানা সময়ে নিজের লেখা অনেক গানকে কবিতায় এবং কবিতাকে গানের রূপ দিয়েছেন। এমনই ৯২টি রূপান্তরিত গান-কবিতার সন্ধান রয়েছে এই গ্রন্থে। ইংরাজি গীতাঞ্জলির পরে রবীন্দ্রনাথ নিজের অনেক রচনা, প্রবন্ধ, কবিতা গান ইত্যাদি ইংরাজিতে অনুবাদ করেছেন। সেগুলি Poems, Crossings, Fruit Gatherings, Lovers gift ইত্যাদিতে সংকলিত। এই তথ্যভাণ্ডারে তাঁর অনুবাদ করা ২৫১ টি রবীন্দ্রসংগীতর ইংরাজিতে প্রথম ছত্র ও গ্রন্থ-নির্দেশের উল্লেখ রয়েছে।

গীতবিতান তথ্যভাণ্ডার  আছে মোট ৭ টি অধ্যায়

  1. প্রধান তথ্যভাণ্ডার
  2. সুরারোপিত সংলাপ
  3. রবীন্দ্রসংগীতের কালানুক্রমিক বিন্যাস
  4. ভাঙাগানের তালিকা
  5. পুনরাবৃত্ত গানের তালিকা
  6. গীতসমৃদ্ধ রবীন্দ্রগ্রন্থ

৬টি অধ্যায়ে বিন্যস্ত ৮৭০ পৃষ্ঠার বইটির দুই মলাটের মধ্যে গীতবিতানের সমস্ত গানের প্রাপ্ত যাবতীয় তথ্যগুলিকে এমনভাবে সংকলিত করা হয়েছে, যাতে যেকোনো গানের নানা খবর মুহূর্তের জেনে নেওয়া সম্ভব।

অন্যান্য বিভাগে সংকলিত হয়েছে তথ্য ও দৃশ্য-নির্দেশ-সহ গীতিনাট্য, নৃত্যনাট্যের ২০৪টি গান বা সুরারোপিত সংলাপ। রবীন্দ্রসংগীতের কালানুক্রমিক বিন্যাসের সঙ্গে বিভিন্ন কাব্যগ্রন্থের প্রকাশের সম্পর্ক, গীতসমৃদ্ধ রবীন্দ্রগ্রন্থ, পুনরাবৃত্ত গান এবং ভাঙাগানের বিস্তারিত তালিকা গ্রন্থটিকে সমৃদ্ধ করেছে।

গত ৮ই জানুয়ারি ২০২০ রোটারি সদনে কবি শ্রী শঙ্খ ঘোষ বইটির আনুষ্ঠানিক প্রকাশ করেন। সুদৃশ্য মলাটের ৮৭০ পৃষ্ঠায় বইটির দাম ১৫০০ টাকা। সমস্ত পুস্তক বিপণী ছাড়াও পাওয়া যায় Amazon.in -এ

শুভেচ্ছাপত্রে কবি শঙ্খ ঘোষ লিখেছেন, “ আমাদের নিরন্তর রবীন্দ্রচর্চার জগতে এটি একটি জরুরি কাজ হিসাবে গণ্য হবে বলে বিশ্বাস করি”।