অন্তর্জলি যাত্রা

অন্তর্জলি যাত্রা এক সামাজিক অভিশাপ। সতীদাহ প্রথা, বাল্যবিবাহ, গঙ্গাসাগরে সন্তান বিসর্জন-এর মত এটিও এক ভয়ঙ্কর কুপ্রথা। অষ্টাদশ শতাব্দী,এমন কি তার পরেও সমাজের কিছু গোঁড়া ধর্মান্ধ মানুষ বিশ্বাস করতেন অন্তর্জলি যাত্রার শাস্ত্রীয় অনুষ্ঠানের মাধ্যমে মুমূর্ষূ ব্যক্তির পারলৌকিক মঙ্গল সাধন এবং অক্ষয় স্বর্গবাস হয়। এই সংস্কার হিন্দুসমাজে এত গভীরভাবে বাসা বেঁধেছিল যে, কোনো হিন্দুই কল্পনাই করতে পারতেন না যে পরিবারের কোনো সদস্যের মৃত্যু নিজের বাড়িতেই হবে।

কিভাবে পালন করা হত অন্তর্জলি যাত্রার নিয়মকানুন? শুনলে আমাদের গায়ে কাঁটা দেয়,ভাবা যায়না কী অসম্ভব কষ্ট দিয়ে রুগ্ন অসহায় মানুষটিকে তিল তিল করে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হত।

পরিবারের কোনো ব্যক্তি অসুস্থ হলে,তাঁর বয়স যাই হোক না কেন, কবিরাজ, হাকিম কিম্বা অভিজ্ঞ চিকিৎসককে দিয়ে চিকিৎসা করানোর ত্রুটি থাকত না। আপ্রাণ চেষ্টা থাকত তাঁকে সুস্থ করে তোলবার। সেবাশুশ্রূষা, ওষুধপথ্য, পূজার্চনা, প্রার্থনা ইত্যাদি নানাভাবে চেষ্টা করা হত প্রিয় মানুষটকে নিজেদের মধ্যে বেঁধে রাখতে। কিন্তু রোগ যখন হাতের বাইরে চলে যেত, বোঝা যেত চিকিৎসায় আর কিছু করবার নেই, তখনই তোড়জোড় শুরু হয়ে যেত অন্তর্জলি যাত্রার মহেন্দ্রক্ষণের। সে যেন এক মহোৎসব। এজন্য আদর্শ স্থান হল গঙ্গাতীর। মনে করা হত গঙ্গায় মৃত্যু হলে আত্মার চিরমুক্তি আর অক্ষয় স্বর্গবাস নিশ্চিত।

প্রথমেই গঙ্গা কিম্বা কাছাকাছি কোনো নদীর পাড়ে একটা ঝুপড়ির মত ছোটো ঘর তৈরি করা হত। সেটি মোটেই স্বাস্থ্যবিধির ধার ধারত না। স্যাঁতসেঁত ঘর, খড়ের চাল, পুরোনো বাতিল খাটিয়া আর  বিছানাপত্র দিয়ে নমো নমো করে কাজটা সারা হত। সম্ভবত মৃত্যুর পরে শ্রাদ্ধ ও অন্যান্য ক্রিয়াকলাপের খরচের কথা ভেবেই এই কার্পন্যতা। আর  ঝুপড়ির পাশেই একটা তুলসীমঞ্চ থাকা অবশ্যম্ভাবী।

এরপরে তাড়াতাড়ি একটা শুভক্ষণ দেখে মৃত্যু পথযাত্রী মানুষটিকে পরিপাটি করে সাজিয়ে, ঢাকঢোল পিটিয়ে, শোভাযাত্রা করে নিয়ে যাওয়া হত নদীতীরের সেই কুটিরে। যে মানুষটি সারাটা জীবন নিজের ঘরের আরামের (?) শয্যায় কাটিয়েছে, নদীতীরের নোংরা ঘরে, সাধারণ খাটিয়ায়, চূড়ান্ত অনাদরে কাটাতে হত জীবনের শেষ মুহূর্তগুলো । আর খাবার ? শুধুমাত্র গঙ্গাজল। দুবেলা জোয়ার আসবার সময়ে তাকে ধরাধরি করে নদীতে নিয়ে নাভি পর্যন্ত ডুবিয়ে রাখা হত কিছুসময়, তারপরে আবার তীরে তুলে আনা। এর নাম নাভিস্নান। এইভাবে দুতিন দিন পরে অনাহারে, বিনা চিকিৎসায়, অমানুষিক কষ্টে তিল তিল করে মানুষটি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ত। সবচেয়ে বিস্ময়ের কথা, এত কষ্ট হবে জেনেও বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই মুমূর্ষূ মানুষটি স্বেচ্ছায় নিজের অন্তর্জলি যাত্রার অনুমতি দিয়ে রাখতেন।   

ঠাকুর পরিবারও এই কুসংস্কার থেকে মুক্ত হতে পারে নি। তাঁরাও সামাজিক অনুশাসন মেনে এই কুপ্রথায় সামিল হয়েছিলেন বারবার। রবীন্দ্রনাথের পূর্বপুরুষ দর্পনারায়নের পুত্র গোপীমোহনের সন্তানদের মধ্যে সূর্যকুমার (১৭৮৪-১৮২০), চন্দ্রকুমার (১৭৮৬-১৮৩২) এবং প্রসন্নকুমার (১৮০১-১৮৮৬) ছিলেন আধুনিক-মনস্ক। দাদা সূর্যকুমারের মৃত্যুর পরে চন্দ্রকুমার গোপীমোহন পরিবারের হাল ধরেন ১৮২০ সালে। দুর্ভাগ্যক্রমে ১৮৩২ সালে অল্পদিনের সামান্য জ্বরবিকারে তাঁর মৃত্যুর হয়। মৃত্যুর আগে চন্দ্রকুমার নিজের জন্য অন্তর্জলি যাত্রার অনুরোধ করে গিয়েছিলেন। প্রসন্নকুমার দাদার চিকিৎসার কোনো ত্রুটির রাখেননি। অন্যদিকে দাদার শেষ ইচ্ছাকে মর্যদা দিয়ে তাঁর অন্তর্জলি যাত্রার সুবন্দোবস্ত করতেও দ্বিধা করেন নি।

সামাজিক কুসংস্কারের বিরুদ্ধে আন্দোলনের উদ্দেশে ১৮৩১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে প্রসন্নকুমার রিফর্মার নামে এক ইংরাজি সাপ্তাহিক প্রকাশ করেছিলেন।ও পরে তার বাংলা সংস্করণও বেরিয়েছিল। সেখানে তিনি অন্তর্জলি যাত্রার বিরুদ্ধে তীব্র নিন্দা করে শক্তহাতে কলম ধরেছিলেন। কিন্তু চন্দ্রনাথের বেলায় তিনিই কেন গঙ্গাযাত্রায় সম্মতি দিলেন সেটাই আমাদের অবাক করে। এমনকি পরিবারের অন্য কেউই এর বিরোধিতা করলেন না। বরং সমসাময়িক কাগজে লেখা হয়েছিল ‘ডাক্তার সাহেব যখন কহিলেন ইঁহার জীবনের আর প্রত্যাশা নাই তখন ঐ কণিষ্ঠ প্রসন্নকুমারবাবু প্রভৃতি বিশেষোদ্যোগী হইয়া তাঁহাকে জ্ঞানপূর্বক শ্রীশ্রীসুরধুনী তীরে লইয়া গিয়াছিলেন। – পতিতপাবনীর তীরে দুই দিবস বাস করনান্তর যথাবিধি অর্থাৎ জলেস্থলে শরীরস্থাপনপূর্বক অন্তর্জালে সহোদরসকলে তারকব্রহ্ম নামোচ্চারণ করিতে লাগিলেন। বাবুও অপূর্বজ্ঞান পূর্বক স্বীয়েষ্ট দেবতা স্মরণকরণ পুরঃসর সুরপুরী গমন করিয়াছেন’।

প্রসন্নকুমার ঠাকুর

জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির আদিপুরুষ নীলমণি ঠাকুরের জ্যেষ্ঠ পুত্র রামলোচনের (স্ত্রী অলকাসুন্দরী) দত্তকপুত্র দ্বারকানাথ ঠাকুর (১৭৯৪-১৮৪৬)। রামলোচনের মৃত্যুর পরে অলকাসুন্দরী দ্বারকানাথকে মাতৃস্নেহে বড় করেছেন। ১৮০৯ সালে ধর্মানিষ্ঠা ও নির্ভিক দিগম্বরী দেবীর সঙ্গে দ্বারকানাথের বিবাহ হয়। দ্বারকানাথ প্রথম জীবনে ছিলেন গোঁড়া বৈষ্ণব,সাত্ত্বিক ও নিরামিষাশী। কিন্তু পরবর্তীকালে মদমাংস, সাহেবিয়ানা-সহ যাবতীয় বিধর্মী বিলাসিতায় গা-ভাসিয়ে দিয়েছিলেন। এ অনাচার দিগম্বরীর সহ্য হয় নি। তিনি নিজেকে দাম্পত্যজীবন থেকে সরিয়ে নিয়েছিলেন।

১৮৩৮ সালে একবার দ্বারকানাথ যখন উত্তরভারত ভ্রমণে গিয়েছিলেন, তখন অলকাসুন্দরী খুবই অসুস্থ হয়ে পড়েন। পিতার অনুপস্থিতিতে ২১ বছর বয়সের দেবেন্দ্রনাথের উপরেই তখন সংসারের ভার। তিনি চিকিৎসার যাবতীয় বন্দোবস্ত ও যথাসাধ্য সেবা করে মাতামহীকে সুস্থ করবার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু যখন শেষ রক্ষা হল না, বৈদ্যরা নির্দেশ দিলেন অলকাসুন্দরীকে অন্তর্জলি যাত্রার জন্য গঙ্গাতীরে নিয়ে যেতে হবে। অলকাসুন্দরী তীব্র প্রতিবাদ করে বললেন, ‘দ্বারকানাথ বাড়িতে থাকত তবে তোরা কখনোই আমাকে লইয়া যাইতে পারিতিস না’। পিতা দ্বারকানাথ ও রামমোহন রায়ের আদর্শে অনুপ্রাণিত দেবেন্দ্রনাথ তখন যথেষ্ট পরিণত, যুক্তিবাদী মনের যুবক। কিন্তু তিনিও অন্তর্জলি সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করলেন না। উপরন্তু গঙ্গাতীরের কুটিরে মাতামহীর পাশে তিনরাত্রি বসেছিলেন, সেবা করেছিলেন যথাযতভাবে।। দ্বারকানাথ ফিরে এসে এই ঘটনায় অত্যন্ত দুঃখ পেয়েছিলেন। তৎকালীন কট্টর সমাজরক্ষকদের ভয়ে দেবেন্দ্রনাথ হয়ত অলকাসুন্দরীর অন্তর্জলী যাত্রায় বাধা দিতে পারেন নি কিন্তু মৃত্যু তাঁর মনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল।

প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যায়, অলকাসুন্দরীর মৃত্যুর পরের বছরে (১৮৩৯) দিগম্বরী দেবীর মৃত্যুর হয়েছিল অত্যন্ত শারীরিক অত্যাচার ও অনিয়মের ফলে, জ্বরবিকারে। সৌভাগ্যক্রমে তিনি মৃত্যুর আগে অন্তর্জলি যাত্রার ইচ্ছাপ্রকাশ করেন নি। কিম্বা আর কেউই তেমন কোনো নির্দেশ দেন নি। যদি দিতেন, হয়ত সমাজের ভয়ে স্বামীপুত্র  সেকথা মেনে নিতে বাধ্য হতেন।

ডা. পূর্ণেন্দুবিকাশ সরকার

9 Responses

  1. অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক লেখা ।আমরা এই ক্ষয়িষ্ণু সমাজে আমরা কিন্তু মৃত্যুপথযাত্রীদের জন্য যে আর এক রকমের অন্তর্জলি যাত্রার বন্দোবস্ত করি হাসপাতালের আই সি ই তে সেটিও একই ধরণের মর্মান্তিক । মৃত্যু যে জীবনেরএক স্বাভাবিক পরিণতি সেটা কে সহজভাবে গ্রহণ করার আজীবন চেষ্টা যে দর্শনের মাধ্যমে সমাজে প্রবাহিত সেটির চর্চা আরও হওয়া বাঞ্ছনীয় । রবীন্দ্রনাথ থেকে হসপিস এই নিয়ে আরও মুক্তমনা আলোচনা বাঞ্ছনীয়

  2. সমাজের ফেলে আসা একটি প্রাচীন কুসংস্কারের দিক নিয়ে আজকের ব্লগে আলোকপাত করা হলো।হয়তো সমাজ এখন অনেক অগ্রগতি লাভ করেছে,কিন্তু মনের সব সংস্কার আজও মনে হয় আমরা মুছে ফেলতে পারি নি,কোনো সুযোগসুবিধার দোহাই দিয়ে আজও তা সযত্নে লালনপালন করে চলেছি।

  3. এই দ্বিচারিতা ট্র্যাডিশন আজ ও বয়ে চলেছে, নিজের পরিবার থেকে কু সংস্কার দূর করাই সমাজ সংস্কারের প্রথম পাঠ।

  4. ইতিহাস এবং নথিপত্র ঘেঁটে উদ্ধার করা তথ্য পরিবেশন করার জন্য ধন্যবাদ ও অভিনন্দন।

    1. ব্লগের লেখা সম্বন্ধে পাঠকদের মূল্যায়ন ও মতামত আমাকে উৎসাহিত করে। ধন্যবাদ।

  5. খুব সুন্দর পোষ্ট। তদানীন্তন সমাজের একটি জীবন্ত দলিল। আলোকপ্রাপ্ত মানুষেরাও কুসংস্কার জেনেও সমাজের ‘পাছে লোকে কিছু বলে’র ভয়ে সেটিকে মেনেছেন। আবার এটাও হতে পারে তাঁর ভিতরের কুসংস্কারের শিকড়টি এতটাই গভীরে ছিল যে সেটিকে উপড়ে ফেলতে সময় লেগেছে। এখনও আমাদের সমাজে এমন বিষয় দেখা যায় – আছে। ধন‍্যবাদ আপনাকে এমন একটি পোষ্টের জন‍্য।

  6. Kamal Kumar Majumder er Antarjoli jatra pore sei samoykar ei kusangskar mon ke pira diyechhilo. Aj Rabindranath Thakur er poribarer ei ghatona jantam na.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *