বীরেন্দ্রনাথ ঠাকুর (১১ নভেম্বর ১৮৪৫ – ১০ মে ১৯১৫)

দেবেন্দ্রনাথের চতুর্থ সন্তান বীরেন্দ্রনাথ ঠাকুরের অসাধারণ বুৎপত্তি  ছিল অঙ্কশাস্ত্রে। ১৮৬৪ সালে তাঁর উন্মাদরোগের  লক্ষণ দেখা দেয়। অনেকের ধারণা অতিরিক্ত অঙ্ক-চর্চাই ছিল এর কারণ। ১৮৬৯ সালে তাঁকে আলিপুরের অ্যাসাইলামে ভর্তি করতে হয়েছিল। হাসপাতাল থেকে ফিরে আসবার পরে পুত্র বলেন্দ্রনাথের জন্ম হয়। কোনো অজানা কারণে ঠাকুর পরিবার বীরেন্দ্র পরিবারের প্রতি কিছুটা উদাসীন ছিলেন। ১৯১৫ সালের ১০ মে ৭০ বছর বয়সে বীরেন্দ্রনাথের জীবনাবসান হয়। তাঁর মৃত্যুতে ঠাকুরবাড়িতে তেমন কোনো শোকের আবহ তৈরি হয়নি। মাত্র দুদিন আগে শান্তিনিকেতনে সাড়ম্বরে রবীন্দ্রনাথের ৫৫তম জন্মদিন উদযাপন করা হলেও বীরেন্দ্রনাথের মৃত্যুতে তাঁর কোনো শোকবার্তা পাওয়া যায় নি।

মাধুরীলতা দেবী (২৬ অক্টোবর ১৮৮৬ – ১৬ মে ১৯১৮)

অনেক বাধাবিপত্তি, দরাদরি আর মনোমালিন্যের পরে রবীন্দ্রনাথ তাঁর আদরের বড় মেয়ে মাধুরীলতার বিয়ে দিয়েছিলেন শরৎকুমার চক্রবর্তীর সঙ্গে, ১৯০১ সালের জুন মাসের ১৫ তারিখে। কর্মসূত্রে  শরৎকুমার  তখন মজঃফরপুরের বাসিন্দা। কিছুদিন পরে তারা কলকাতায় ফিরে আসেন। ১৯১৩ সালে পারিবারিক বিবাদের কারণে শরৎকুমার এবং রবীন্দ্রনাথের সম্পর্কের অবনতি হলে শরৎকুমার সস্ত্রীক জোড়াসাঁকো ত্যাগ করে এন্টালির কাছে এক ভাড়াবাড়িতে চলে যান। রবীন্দ্রনাথ অনেক চেষ্টা করেও সেই সম্পর্ক  স্বাভাবিক করতে পারেন নি। ১৯১৭ সালে মাধুরীলতা যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত হন এবং তাঁর গর্ভস্থ শিশুটির মৃত্যু হয়। তখন স্নেহময় রবীন্দ্রনাথ নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারেন নি। শরৎকুমারের অসৌজন্য ব্যবহারকে উপেক্ষা করে তিনি দিনের পর দিন অসুস্থ মেয়েকে দেখতে গিয়েছেন, পাশে বসে শুশ্রূষা করেছেন, মাথায় হাত বুলিয়ে তাঁকে একটু আরাম দিতে চেয়েছেন।  কিন্তু হায়, পিতার রক্তাক্ত হৃদয়কে উপেক্ষা করে বেলা অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে থাকতেন, আর পাশের ঘরে তাঁর জামাতা, যাকে দশ হাজার টাকা বরপণ দিয়ে কিনতে হয়েছিল, টেবিলের উপরে পা তুলে বিশ্ববন্দিত মানুষটিকে নিরন্তর অপমান আর অশ্রদ্ধা করে চলতেন। তবুও রবীন্দ্রনাথ মেয়ের চিকিৎসার সমস্ত ভার বহন করেছিলেন, আর জামাই না চাইলেও মেয়েকে নিয়মিত দেখতে যেতেন।

রবীন্দ্রনাথের কোলে মাধুরীলতা

দীর্ঘ রোগভোগের পরে ১৯১৮ সালে মে মাসের ১৬ তারিখে মাত্র বত্রিশ বছর বয়সে মাধুরীলতার মৃত্যু হল। যক্ষ্মা রোগের ওষুধ তখনও আবিষ্কার হয়নি। রবীন্দ্রনাথ মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিলেন এই দিনটির জন্য। সেদিন সকালে মেয়েকে দেখতে যাবার সময় পথেই তাঁর মৃত্যু-সংবাদ পেয়ে রবীন্দ্রনাথ জোড়াসাঁকোয় ফিরে এলেন। বলেছিলেন বেলার মৃত মুখ দেখবার বেদনা তিনি সহ্য করতে পারবেন না। জোড়াসাঁকোর দোতলার ঘরে একান্ত নীরবে শূন্যতার এই শোককে অতিক্রম করবার চেষ্টা করেছিলেন।

রবীন্দ্রনাথ জানতেন শোকের আবহ থেকে নিজেকে বিযুক্ত করতে না পারলে ঈশ্বর-নির্দিষ্ট কাজ তিনি সম্পন্ন করতে পারবেন না। একের পর এক প্রিয়জনের মৃত্যুশোক সহ্য করবার ক্ষমতা ঈশ্বর তাঁকে দিয়েছিলেন। তাই সেদিন সন্ধ্যায় ল্যান্সডাউন রোডের বাসায় রাণুর সঙ্গে দেখা করতে গেলেন। বেলার মৃত্যুর দিনেই স্নেহের রাণুর সঙ্গে কবির প্রথম দেখা। ২৭ জুলাই রাণুকে লিখলেন, ‘আমার খুব দুঃখের সময়েই তুমি আমার কাছে এসেছিলে। আমার যে মেয়েটি সংসার থেকে চলে গেছে সে আমার বড় মেয়ে, শিশুকালে তাকে নিজের হাতে মানুষ করেছি, … কিন্তু সে যে মুহূর্তে আমার কাছে বিদায় নিয়ে চলে গেল সেই মুহূর্ত্তেই তুমি আমার কাছে এলে – আমার মনে হল যেন এক স্নেহের আলো নেবার সময় আর এক স্নেহের আলো  জ্বালিয়ে দিয়ে গেল। তাকে আমরা বেলা বলে ডাকতুম, তার চেয়ে ছোট আর এক মেয়ে আমার ছিল তার নাম ছিল রানি, সে অনেকদিন হল গেছে। কিন্তু দুঃখের আঘাতে যে অবসাদ আসে তা নিয়ে ম্লান হতাশ্বাস হয়ে দিন কাটালে ত আমার চলবে না। কেননা আমার উপরে যে কাজের ভার আছে। তাই আমাকে দুঃখ ভোগ করে দুঃখের উপরে উঠতেই হবে। সেই জন্যেই খুব বেদনার সময় তুমি যখন তোমার সরল ও সরস জীবনটি নিয়ে খুব সহজে আমার কাছে এলে এবং এক মুহূর্তে আমার স্নেহ অধিকার করলে তখন আমার জীবন আপন কাজে বল পেলে, আমি প্রসন্নচিত্তে আমার ঠাকুরের সেবায় লেগে গেলুম।’ এই চিঠিটি রবীন্দ্রনাথের মানসিক স্থিতির এক উজ্জ্বল চিত্ররূপ। কাবুলিওয়ালা গল্পের মিনির চরিত্রটি বেলার কথা ভেবেই লেখা। পলাতকা কাব্যের ‘শেষ প্রতিষ্ঠা’ কবিতাতে  মাধুরীলতার মৃত্যুর কথা রয়েছে। তাঁর স্মরণে রবীন্দ্রনাথ ‘মাধুরীলতা বৃত্তি’ চালু করেছিলেন।

সোমেন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৩ সেপ্টেম্বর ১৮৫৯- ৩০ জানুয়ারি ১৯২২)

বয়সে মাত্র দু বছরের বড় হলেও সোমেন্দ্রনাথ ছিলেন রবীন্দ্রনাথের সহপাঠী, বাল্য ও কৈশোরের সঙ্গী আর তাঁর কাব্যচর্চার অন্যতম পৃষ্ঠপোষক। ১৮৭৯ সালের মার্চ মাস থেকে সোমেন্দ্রনাথের মস্তিষ্কবিকৃতির লক্ষণ দেখা দিয়েছিল। তবে তা কখনই  বাড়াবাড়ির পর্যায়ে পৌঁছায়নি। ১৯২২ সালের ৩০ জানুয়ারি তাঁর মৃত্যু হয়, প্রায় নিঃশব্দে, লোকচক্ষুর আড়ালে। ৯ ফেব্রুয়ারি জোড়াসাঁকোয় তাঁর শ্রাদ্ধানুষ্ঠানে উপস্থিত থাকলেও রবীন্দ্রনাথ কোনো স্মৃতিচারণা করেছিলেন বলে জানা যায় না।  একসময়ের নিত্যসঙ্গী সোমেন্দ্রনাথের সঙ্গে পরবর্তীকালে তাঁর মানসিক দূরত্বই সম্ভবত এই শীতলতার অন্যতম কারণ।     

দ্বিপেন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৪ জুলাই ১৮৬২-১৭ সেপ্টেম্বর ১৯২২)

দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের জ্যেষ্ঠ পুত্র দ্বিপেন্দ্রনাথ রবীন্দ্রেনাথের চাইতে মাত্র ১ বছরের ছোটো। ১৯২২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বিশ্বভারতীর সাহায্যার্থে কলকাতার ম্যাডন থিয়েটারে রবীন্দ্রনাথের শারদোৎসব নাটক অভিনয়ের আয়োজন করা হয়েছিল। ঠিক ছিল এই নাটকে দাদাঠাকুরের ভূমিকায় অভিনয় করবেন দ্বিপেন্দ্রনাথের ছেলে দিনেন্দ্রনাথ। দ্বিপেন্দ্রনাথ সে সময়ে শান্তিনিকেতনেই ছিলেন।  অভিনয়ের আগের দিন খবর এল, আকস্মিক হৃদরোগে তাঁর জীবনাবসান হয়েছে। দিনেন্দ্রনাথ তড়িঘড়ি শান্তিনিকেতনে চলে গেলে অবনীন্দ্রনাথ  ঠাকুরকে প্রায় বিনা প্রস্তুতিতে তাঁর জায়গায় অভিনয় করতে হয়েছিল। শারদোৎসব অভিনয়ের শেষে ১৯ সেপ্টেম্বর রবীন্দ্রনাথকে পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি অনুযায়ী বোম্বাই চলে যেতে হয়েছিল। এজন্য তিনি শান্তিনিকেতনে দ্বিপেন্দ্রনাথকে দেখতে যেতে পারেন নি। এটি রবীন্দ্রনাথের চরিত্র-বিরোধী ঘটনা। হয়ত বৃহত্তর কর্তব্যের আহ্বানে তিনি শোকস্তব্ধ পারিবারের পাশে থাকতে পারেন নি। যদিও এজন্য  তাঁকে  যথেষ্ট সমালোচনা আর বিরূপ কটাক্ষ সহ্য করতে হয়েছিল। 

সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর (১ জানুয়ারি ১৮৪২ – ৯ জানুয়ারি ১৯২৩)

মেজদাদা সত্যেন্দ্রনাথের হাত ধরেই রবীন্দ্রনাথের বৃহত্তর ভারত এবং পাশ্চাত্যজগতের সঙ্গে পরিচয়। কর্মজীবনের অনেকটা সময় আমেদাবাদে কাটালেও জোড়াসাঁকোর সাংস্কৃতিক পরিবেশের সঙ্গে ছিল তাঁর নিবিড় সম্পর্ক। জোড়াসাঁকোর কোলাহলপূর্ণ পরিবেশ ভালো না লাগায়  সত্যেন্দ্রনাথ সস্ত্রীক পার্কস্ট্রিটের  ভাড়াবাড়িতে বাস করতেন। ছোটো বয়সে বাতের অসুখে ভুগলেও অর্শরোগ ছিল তাঁর নিত্যসঙ্গী। এ রোগটি দেবেন্দ্রনাথ এবং রবীন্দ্রনাথেরও ছিল। ১৯২৩ সালের ৯ জানুয়ারি এই অর্শরোগেই তাঁর মৃত্যু হয়েছিল কলকাতার বাসভবনেই। ইন্দিরা দেবী লিখেছেন, ‘যেদিন রাত্রে অবস্থা খারাপ দেখে সুরেনরা বাড়ি গেল, সেদিনই রাত তিনটেয় … সব শেষ হয়ে গেল।।.. তার আগে্ যখন অক্সিজেন আনা হল, তখন নিজেই বললেন আমারও অক্সিজেন নিতে হবে? এতদূর জ্ঞান ছিল। খবর পেয়ে রবীন্দ্রনাথ ছুটে এসেছিলেন, খাটের কাছে মাটিতে বসে উপাসনা করেছিলেন।’ ৬২ বছরের রবীন্দ্রনাথ  শোকাহত হয়েছিলেন কিন্তু কোনোরকম বহিঃপ্রকাশ ছিলনা। পরবর্তীকালে তাঁর উদ্দেশ্যে কোনো রচনা বা স্মৃতিচারণারও উল্লেখ নেই।

জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর

জ্যোতরিন্দ্রনাথ ঠাকুর (৪ মে ১৮৪৯-৪ মার্চ ১৯২৫)

নতুন দাদা জ্যোতিরিন্দ্রনাথের সাহচর্য ও প্রভাব রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যপ্রতিভা উন্মেষের অন্যতম সোপান। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ১৯০৭ সালে রঁচিতে মোরাবাদী নামে একটা ছোটো পাহাড় কিনে শান্তিধাম নামে বাড়ি বানিয়ে জীবনের শেষ আঠেরোটি বছর প্রায় নিঃশব্দে, একাকী কাটিয়ে দিয়েছিলেন। শোনা যায় স্ত্রী কাদম্বরীর মৃত্যুর আঘাতে তিনি সাময়িকভাবে মানসিক ভারসাম্য হারিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ যদিও কোনোদিনই রাঁচিতে যান নি, কিন্তু দুই ভাইয়ের মধ্যে সৌহার্দ্য চিরকালই অমলিন ছিল। ১৯২৫ সালের ৪ মার্চ শান্তিধামে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ প্রায় সকলের অগোচরে অমৃতলোকে যাত্রা করেন। রবীন্দ্রনাথ তখন শান্তিনিকেতনে, প্রাতিষ্ঠানিক নানা কাজে চূড়ান্ত ব্যস্ততা। জ্যোতিরিন্দ্রনাথের মৃত্যুতে রবীন্দ্রনাথের মানসিক অভিব্যক্তির বিষয়টি  প্রায় অজানা।

দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর

দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর (১১ মার্চ ১৮৪০-১৮ জানুয়ারি ১৯২৬)

বিশিষ্ট কবি, তত্ত্বজ্ঞানী, দার্শনিক এবং গণিতজ্ঞ বড় দাদাকে রবীন্দ্রনাথ অত্যন্ত শ্রদ্ধা করতেন। জীবনের শেষ কুড়ি বছর তিনি শান্তিনিকেতনে কাটিয়েছেন। মৃত্যুকালে বয়স হয়েছিল ৮৭ বছর। ১৯২৬ সালের ১৮ জানুয়ারি শান্তিনিকেতনে ঘুমের মধ্যে  নিঃশব্দে  তিনি পরলোকে যাত্রা করেছিলেন। সেদিন ছিল সরস্বতী পূজা, বাগদেবী যেন তাঁর বরপুত্রকে নিজের কোলে টেনে নিলেন। তাঁর ঘটনাবিহীন সরল নিরুপদ্রপ শান্ত জীবনের মত মৃত্যুও ছিল অত্যন্ত সাধাসিধে। ঠাণ্ডা লেগে সামান্য নিউমোনিয়ার উপসর্গ ছাড়া তাঁর কোনো অসুখই ছিল না। মৃত্যুর আগের দিনও কবিতার প্রুফ দেখেছেন, নতুন কবিতা লিখেছেন। রবীন্দ্রনাথ তখন লখনৌতে ভ্রমণরত। দুঃসংবাদ পেয়ে সমস্ত কর্মসূচী বাতিল করে শান্তিনিকেতনে ফিরে আসেন। সুকুমারী হালদারকে লিখেছেন, ‘বড়োদাদাও গেলেন – এখন আমিই শীতের গাছে শেষ পাতাটার মত উত্তরে হাওয়ায় কাঁপছি –  ঝরে পড়লেই হয় – বোঁটাও আলগা হয়েছে’।  কবির বয়স তখন ৬৫ বছর। ২৮ জানুয়ারি শান্তিনিকেতনের ছাতিমতলায় শ্রাদ্ধানুষ্ঠানে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘সংসারের ভিতর মৃত্যুকে ক্ষতি বলে জানি, দুঃখ বলে জানি। জীবনের বিরুদ্ধ, অস্তিত্বের বিরুদ্ধ, ‘না’ বলেই জানি। এই সঙ্কীর্ণ পরিধির আবেষ্টনে অমৃতের মধ্যে মৃত্যুর যে প্রতিষ্ঠা তা দেখতেই পাইনে। কাছের দিকটাতে চেয়ে দেখি মৃত্যু আমাদের পক্ষে প্রকাণ্ড অভাবের রূপ ধরে আসে, অথচ এই বিপুল বিশ্বসংসারের দিকে যখন তাকাই তখন দেখি তার জ্যোতি কোথাও ম্লান নয়, আনন্দের সঙ্গীত, সুর্যের মহিমা আকাশে বিস্তৃত, কোনও জায়গায় বিষাদের কোনও চিহ্ন নেই’। ওইদিন দ্বিজেন্দ্রনাথের পূণ্যস্মৃতির উদ্দেশ্যে শান্তিনিকেতনে একটি কূপ খননের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।                                                                         

সুধীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৩ জুলাই ১৮৬৯ – ৭ নভেম্বর ১৯২৯)

দ্বিজেন্দ্রনাথের চতুর্থ পুত্র সুধীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে রবীন্দ্রনাথ অসম্ভব ভালোবাসতেন। এঁরই হাতে ছিল সাধনা পত্রিকার সম্পাদনার ভার। ১৯২৯ সালের ৭ নভেম্বর হঠাৎ তাঁর মৃত্যু হয়, সম্ভবত শ্বাসকষ্ট-জনিত সমস্যায়। ৮ নভেম্বর রবীন্দ্রনাথ ইন্দিরা দেবীকে লিখলেন, ‘আজ সকালে সুধীরের হঠাৎ মৃত্যু হয়েছে। আমরা কেউই জানতে পারিনি যে তার সাঙ্ঘাতিক পীড়া হয়েছে। যে ডাক্তার ওকে দেখছিল সে নিশ্চয়ই ঠিক বুঝতে পারেনি। তিন দিন আগে খুব হাঁপানিতে কষ্ট পাচ্ছিল তার পরে আজ হঠাৎ এই বিপদ। নেপু ছেলেমানুষ, সে হতবুদ্ধি হয়ে গেছে।’ ১৮৯৪ সালে ২৫ মে সুধীন্দ্রনাথের বিয়ের দিনে রবীন্দ্রনাথ ‘বাজিল কাহার বীণা’ গানটি রচনা করে উপহার দিয়েছিলেন।

নীতীন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায় (৫ ডিসেম্বর ১৯১১ – ৭ আগস্ট ১৯৩২)

রবীন্দ্রনাথের কনিষ্ঠা কন্যা মীরা ও নগেন্দ্রনাথের পুত্র রবীন্দ্রনাথের আদরের নাতি নীতীন্দ্রনাথের জন্ম জোড়াসাঁকোর বাড়িতে। নীতীন্দ্রনাথের লেখাপড়া শান্তিনিকেতনের ব্রহ্মচর্যাশ্রমে। ১৯২৩ সালের এপ্রিলে নীতীন্দ্রনাথ উচ্চশিক্ষার্থে জার্মানি যান।  সেখানে যক্ষ্মায় আক্রান্ত হয়ে মাত্র ২০ বছর বয়সে ৭ আগস্ট ১৯৩২ সালে তাঁর মৃত্যু হয়।  নীতীন্দ্রনাথের অসুস্থতার খবর জেনে রবীন্দ্রনাথ উদ্বিগ্ন ছিলেন, কিন্তু কথাবার্তা, চিঠিপত্র বা ব্যবহারে সেটা প্রকাশ করতেন না। বরং আশার কথা শোনাতেন, কিছু রসিকতাও করতেন। কিছুদিন আগে যখন তাঁর অসুখের সংবাদ পেয়েছিলেন, তখনই রবীন্দ্রনাথ বুঝতে পেরেছিলেন যে মৃত্যু তাঁর শিয়রে এসে দাঁড়িয়েছে। প্রিয় নাতির মৃত্যুর পরে তাঁর উদ্দেশে লিখেছেন ‘ধাবমান’, ‘মাতা’, ‘বিশ্বলোক’ ইত্যাদি অনেক কবিতা। ৮ আগস্ট মীরা দেবীকে লিখেছেন, ‘নীতুকে খুব ভালোবাসতুম, তা ছাড়া তার কথা ভেবে প্রকাণ্ড দুঃখ চেপে বসেছিল বুকের মধ্যে। কিন্তু সর্বলোকের সামনে নিজের গভীরতম দুঃখকে ক্ষুদ্র করতে লজ্জা করে।… অনেকে বললে এবার বর্ষামঙ্গল বন্ধ থাক – আমার শোকের খাতিরে। আমি বললুম সে হতেই পারে না। আমার শোকের দায় আমিও নেব । বাইরের লোকে কি বুঝবে তার ঠিক মানেটা।’ কাকতালীয় কিনা জানা নেই, তবে সেই সময় থেকে রবীন্দ্রনাথ নিজের নামে আগে ‘শ্রী’ লেখা বন্ধ করে দিয়েছিলেন।

দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর

দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৬ ডিসেম্বর ১৮৮২ – ২১ জুলাই ১৯৩৫)

তাঁর সমস্ত গানের ভাণ্ডারী দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, ‘তাঁর চেষ্টা না থাকলে আমার গানের অধিকাংশই বিলুপ্ত হত। কেননা, নিজের রচনা সম্পর্কে আমার বিস্মরণশক্তি অসাধারণ। আমার সুরগুলিকে রক্ষা করা এবং যোগ্য এমনকি অযোগ্য পাত্রকেও সমর্পণ করা তার যেন একাগ্র সাধনার বিষয় ছিল।’ আশ্রমের কিছু আভ্যন্তরীণ সমস্যার কারণে ১৯৩৪ সালের জুলাই মাসে শান্তিনিকেতনের পাট চুকিয়ে দিনেন্দ্রনাথ কলকাতায় চলে এসেছিলেন। সেখানেই ১৯৩৫ সালের ২১ জুলাই তাঁর মৃত্যু হয়। রবীন্দ্রনাথ তখন শান্তিনিকেতনে, নিজের সৃষ্টি ও বিশ্বভারতীর নানা কাজে নিমগ্ন। এমন সময় টেলিগ্রাম মারফৎ দিনেন্দ্রনাথের মৃত্যু সংবাদ  এসে পৌঁছাল। কবির বয়স তখন ৭৪ বছর। অসংখ্য মৃত্যু ও শোকের পথ পেরিয়ে এসে এখন তাঁর কাছে মৃত্যু একটি সংবাদ মাত্র, মনকে স্পর্শ করে কিন্তু ভেদ করতে পারেনা। তাই প্রিয় নাতির মৃত্যুতে তাঁর দৈনন্দিন কাজে কোনো ছেদ পড়েনি সেদিন। তবে সেদিন দিনেন্দ্রনাথের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেছিলেন, ‘আমার কবি-প্রকৃতিতে আমি যে দান করেছি সেই গানের বাহন ছিলেন দিনেন্দ্র। অনেকে এখান থেকে গেছেন, সেবাও করেছেন, কিন্তু তার রূপ নেই বলে ক্রমশ তারা বিস্মৃত হয়েছেন। কিন্তু দিনেন্দ্রর দান এই যে আনন্দের রূপ,  তা যাবার নয় – যত দিন ছাত্রদের সংগীতে এখানকার শালবন প্রতিধ্বনিত হবে, বর্ষে বর্ষে নানা উপলক্ষে উৎসবের আয়োজন চলবে, ততদিন তার স্মৃতি বিলুপ্ত হতে পারবে না, ততদিন তিনি আশ্রমকে অভিগত করে থাকবেন – আশ্রমের ইতিহাসে তার কথা ভুলবার নয়।’ দিনেন্দ্রনাথের মৃত্যুতে শান্তিনিকেতনের সমস্ত বিভাগ ২২ জুলাই বন্ধ রাখা হয়েছিল।

সুরেন্দ্রনাথ ঠাকুর (২৬ জুলাই ১৮৭২ – ৩ মে ১৯৪০)

সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের জ্যেষ্ঠ পুত্র সুরেন্দ্রনাথের চাইতে রবীন্দ্রনাথ এগারো বছরের বড় হলেও দুজনের সম্পর্কে ছিল বন্ধুর মত। রবীন্দ্রনাথের বহু কর্মাকাণ্ডের সঙ্গী সুরেন্দ্রনাথের মৃত্যু হয়েছিল ৩ মে ১৯৪০ সালে, মাত্র ৪৩ বছর বয়সে। রবীন্দ্রনাথ সেই সময়ে মংপুতে রয়েছেন মৈত্রেয়ী দেবীর অতিথি হিসাবে। ৫ মে সেখানে কবির জন্মদিনের উৎসব পালিত হল। পরের দিন রবীন্দ্রনাথ সুরেন্দ্রনাথের মৃত্যুসংবাদ পেয়ে ইন্দিরা দেবীকে লিখলেন, ‘তোরা বোধহয় জানিস আমার নিজের ছেলেদের চেয়ে সুরেনকে আমি ভালোবেসেছিলুম। নানা উপলক্ষে তাকে আমার কাছে টানবার ইচ্ছা করেছি বারবার, বিরুদ্ধ ভাগ্য নানা আকারে কিছুতেই সম্মতি দেয় নি। এইবার মৃত্যুর ভিতর দিয়ে বোধ হয় কাছে আসব, সেইদিন নিকটে এসেছে।’  এই চিঠি লেখার ঠিক এক বছর বাদেই রবীন্দ্রনাথের মৃত্যু হয়েছিল। সুরেন্দ্রনাথের মৃত্যুর খবরে রবীন্দ্রনাথ সারাদিন নীরব ছিলেন, তাঁর স্মরণে লিখেছেন ‘মৃত্যু’ শিরোনামে একটি কবিতা 

এই বিরাট পারিবারিক শোক ছাড়াও অনেক নিকটবন্ধু, শিষ্য, অনুরাগী আর সহচরের মৃত্যু একের পর এক ঢেউয়ের মৎ আছড়ে পড়েছিল রবীন্দ্রনাথের জীবনে।

আছে দুঃখ আছে মৃত্যু – হেমন্ত মুখোপাধ্যায়

বইওয়ালা বুক ক্যাফে প্রকাশিত দিনগুলি তাঁর বই থেকে পুনর্মুদ্রিত

Please rate this

One Response

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *