রবিবাবুর-গান থেকে রবীন্দ্রসংগীত

অষ্টাদশ শতাব্দীর আগে কণ্ঠস্বর কিম্বা অন্য কোনো শব্দ  রেকর্ড করবার পদ্ধতি মানুষের জানা ছিল না। গান, যন্ত্রসংগীত বা যেকোনো সাংস্কৃতিক-চর্চা এক প্রজন্ম থেকে পরের প্রজন্মে বাহিত হত মূলত গুরুশিষ্যের মাধ্যমে। এখন যেমন পুরানো দিনের গান, আবৃত্তি বা যন্ত্রসংগীত শুনে নেওয়া, এমনকি সেটি শিখে নেবার জন্য নানা উপাদান হাতের কাছেই মজুত রয়েছে,সেকালে সেই সুবিধাটা ছিল না। তখন শিল্পী তার ছাত্রকে যে গানটা শেখাতেন,ছাত্র সেটি শেখাত তার ছাত্রেকে। অর্থাৎ সংগীত ছিল মূলত শ্রুতি ও স্মৃতি নির্ভর ।

ফরাসি চিত্রকর  ও লেখক Edouard-Leon Scott de Martinville (১৮১৭-১৮৭৯)  ৯ এপ্রিল ১৮৬০ সালে তার আবিষ্কৃত ফোনাটোগ্রাফ (Phonautograph) যন্ত্রে ভূষোকালি মাখানো কাগজের উপরে তরঙ্গায়িত দাগের মাধ্যমে সর্বপ্রথম মানুষের কণ্ঠস্বর রেকর্ড করেন।  যদিও সেই রেকর্ড পুনরায় শুনে নেবার কোনো ব্যবস্থা তখন ছিল না। 

১৮৭৭ সালে প্রখ্যাত আমেরিকান বিজ্ঞানী Thomas Edison (১৮৪৭-১৯৩১)-এর ফোনোগ্রাফ যন্ত্রের আবিষ্কার শব্দ-রেকর্ড জগতের নতুন দিগন্ত খুলে দিল । এই যন্ত্রে টিনের পাতলা চোঙার পাতের উপরে কণ্ঠস্বর রেকর্ড করা হত এবং তা আবার বাজিয়ে শোনাও যেত। ফোনোগ্রাফ যন্ত্রে্র শব্দ-গ্রহন ও শ্রবণের সুবিধা বৈজ্ঞানিক মহলে তুমুল আলোড়ন তুলেছিল। তবে সেই রেকর্ডের গুণমান ছিল অত্যন্ত নিম্ন আর স্থায়িত্বও স্বল্পকালীন।

পরবর্তীকালে Alexander Graham Bell (১৮৪৭-১৯২২) ফোনোগ্রাফে ধাতব নলের গায়ে মোমের আবরণ লাগিয়ে তার উপরে শব্দ রেকর্ড করবার ব্যবস্থা করলেন। এগুলি সিলিণ্ডার রেকর্ড নামে পরিচিত ছিল। বহুবার ব্যবহার করা সম্ভব বলে সিলিণ্ডার রেকর্ড খুবই জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল। ১৮৮৭ সালের ৮ নভেম্বর জার্মান বিজ্ঞানী Emile Berliner (১৮৫১-১৯২৯) সিলিণ্ডার রেকর্ডের পরিবর্তে চ্যাপ্টা ও পাতলা চাকতি রেকর্ড বা ডিস্ক রেকর্ড তৈরির পদ্ধতি আবিষ্কার করেন।  সিলিণ্ডার রেকর্ডের তুলনায়  ডিস্ক রেকর্ড তৈরি ও ব্যবহার করা অনেক সহজ। এগুলির একাধিক কপি করা সম্ভব আর টেঁকেও বহুদিন। ফলে সিলিণ্ডার রেকর্ডের প্রচলন ধীরে ধীরে শেষ হয়ে গেল । আজ আর কোথাও মোমের সিলিণ্ডার সিলিণ্ডার রেকর্ডে পাওয়া যায় না।

ভারতবর্ষে সাউণ্ড রেকর্ডিং-এর সূচনা হয়েছিল ইংলণ্ডের  গ্রামোফোন  কোম্পানীর প্রধান সাউণ্ড রেকর্ডিস্ট  উইলিয়াম গিসবার্গের (William Gaisberg ১৮৭৩-১৯৫১) মাধ্যমে। ১৯০২ সালে মেধা সন্ধানের জন্য তিনি ভারতে আসেন এবং ১১ নভেম্বর কলকাতার গ্রেট ইস্টার্ণ  হোটেলে গহরজানও আরও কয়েকজনের কণ্ঠে কিছু হিন্দুস্থানী সংগীত রেকর্ড করে বিলাতে নিয়ে যান।

প্রসিদ্ধ গন্ধ-ব্যবসায়ী হেমেন্দ্রমোহন বসুকে (১৮৬৪-১৯১৬) ভারতবর্ষে রেকর্ড শিল্পের অগ্রণী হিসাবে উল্লেখ করা যায়। ছাপাখানা, সাইকেল, মোটরগাড়ি, সুগন্ধি ইত্যাদি নানা ব্যবসায় তিনি প্রসিদ্ধ ছিলেন। কিন্তু তরুণ লেখকদের উৎসাহ দেবার জন্য প্রবর্তীত কুন্তলীন পুরস্কার তার অন্যতম কৃতিত্ব। প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যায় একটি ছোটো গল্পের জন্য জগদীশচন্দ্র বসুই প্রথম এই পুরস্কারের প্রাপক ছিলেন। ১৯০২-১৯০৩ সাল নাগাদ হেমেন্দ্রমোহন বসু নিছক শখের জন্য  বিদেশ থেকে ফোনোগ্রাম যন্ত্র আমদানি করে বন্ধুবান্ধব ও পরিচিত জনের কণ্ঠস্বর রেকর্ড করতে শুরু করেন। জগদীশচন্দ্র বসু, পি সি রায়, রবীন্দ্রনাথ ছিলেন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য। ১৯০৫-০৬ সালে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের সময়ে রবীন্দ্রনাথ প্রচুর স্বদেশী গান রচনা করেন। সেগুলি গেয়ে শোনানোর জন্য তিনি প্রায়ই জগদীশচন্দ্রের বাড়িতে যেতেন। হেমেন্দ্রমোহন ছিলেন কবির ঘনিষ্ট বন্ধু। জগদীশচন্দ্রের বাড়িতে রবীন্দ্রনাথের গাওয়া প্রচুর স্বদেশী গান তিনি তার মোমের সিলিণ্ডার রেকর্ডে ধরে রেখেছিলেন।

হেমেন্দ্রমোহন বসু

বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সময়ে রবীন্দ্রনাথের স্বদেশী গানের সীমাহীন চাহিদায় উদ্বুদ্ধ হয়ে ১৯০৬ সালের ৫ই ফেব্রুয়ারি  হেমেন্দ্রমোহন এইচ বোসেজ রেকর্ড নামে সিলিণ্ডার রেকর্ড বিক্রয় কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা এবং ব্যবসায়িক ভিত্তিতে রেকর্ডিং করতে শুরু করেন। সেখানে তিনি রবীন্দ্রনাথের অনেক গান রেকর্ড করেছিলেন। সিলিণ্ডার রেকর্ডে রবীন্দ্রনাথের নিজের কণ্ঠের গানের প্রচার শুরু হয় ১৯০৬ সাল থেকেই। এই সময়েই তাঁর কণ্ঠে ‘বন্দেমাতরম’ গানটি রেকর্ড  করা হয়েছিল, যা রবীন্দ্রনাথের  নিজের রচনা বাদে  একমাত্র রেকর্ড। মোমের তৈরি সিলিণ্ডার রেকর্ডগুলি ছিল সংরক্ষণ অনুপযোগী এবং অচিরেই সেগুলি প্রায় সবই নষ্ট হয়ে গিয়েছে, বিলুপ্ত হয়েছে রবীন্দ্রনাথের তেজদীপ্ত কণ্ঠের বহু অমূল্য রেকর্ড।

৮ই নভেম্বর ১৯০১ সালে ইংলণ্ডের  গ্রামোফোন  কোম্পানীর ভারতীয় শাখা খোলা হয়েছিল কলকাতার চৌরঙ্গীতে। গ্রামোফোন কোম্পানীর তরফে ১৯০৭-এ বেলেঘাটায় প্রথম রেকর্ড তৈরির প্রেশিং মেশিন বসানো হয়। উৎপাদন শুরু হল আধুনিক ডিস্ক রেকর্ডের। ডিস্ক রেকর্ডের  মত সিলিণ্ডার রেকর্ডের একাধিক কপি করবার সুযোগ ছিল না, ফলে একই গান গায়ককে দিয়ে বহুবার গাওয়াতে হত। তাছাড়া ডিস্ক রেকর্ডে শব্দের গুণমান ছিল অনেক উন্নত। অনিবার্য কারণে প্রতিযোগীতায় পিছিয়ে পড়তে পড়তে একদিন ফুরিয়ে গেল সিলিণ্ডার রেকর্ডের যুগ।

সিলিণ্ডার রেকর্ডের দিন শেষ হতে চলেছে বুঝতে পেরে অভিজ্ঞ হেমেন্দ্রমোহন ফ্রান্সের প্যাথে কোম্পানীর সঙ্গে যৌথভাবে ডিস্ক রেকর্ড ব্যবসার শুরু করেন ১৯০৮ সাল নাগাদ। তিনি তার সিলিণ্ডার রেকর্ডগুলি ডিস্ক রেকর্ডে রূপান্তর করবার জন্য ফ্রান্সের প্যাথে কোম্পনীতে পাঠিয়ে দিতেন। সেখান থেকে ‘প্যাথে-এইচ বোসেজ রেকর্ড’ নামে ডিস্ক রেকর্ড হয়ে ফিরে আসত। এই রেকর্ডগুলির একটি আংশিক তালিকা প্রকাশিত হয়েছিল ১৫ই মার্চ ১৯০৮-এর ‘বেঙ্গলি’ দৈনিকে। রবীন্দ্রনাথের গাওয়া ‘বন্দেমাতরম’ এবং ‘সোনার তরী’ আবৃত্তির রেকর্ড ছাড়াও আরও চারজন রবীন্দ্রসংগীত শিল্পীর উল্লেখ ছিল সেখানে। কে সি সেন (দেখো সখা, ভুল করে ভালোবেসো না), রাণীসুন্দরী (যদি বারণ কর তবে গাহিব না), ( বিদায় করেছ যারে আঁখি জলে), সুরেন্দ্রনাথ মৈত্র (বহে নিরন্তর অনন্ত আনন্দধারা), (দাঁড়াও আমার আঁখির আগে), মানদাসুন্দরী (আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে)।

গ্রামোফোন, জেনোফোন, অডিঅন ইত্যাদি কোম্পানী থেকে তখন নতুন নতুন রেকর্ড বেরোচ্ছে, প্রকাশিত হচ্ছে অসংখ্য রবীন্দ্রসংগীত।  এই অসম প্রতিযোগীতায় হেমেন্দ্রমোহনের রেকর্ড ব্যবসা ধীরে ধীরে অবলুপ্ত হয়ে গেল।

হেমেন্দ্রমোহনের প্যাথে-এইচ বোসেজ রেকর্ড আর গ্রামোফোন কোম্পানী ছাড়াও নিকল, অডিয়ন, জেনোফোন, বেকা-গ্রাণ্ড ইত্যাদি আরও কয়েকটি রেকর্ড কোম্পানী থেকেও নানা শিল্পীর কণ্ঠে বহু রবীন্দ্রসঙ্গীত প্রকাশিত হয়েছিল। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকজনের নাম মানদাসুন্দরী, কৃষ্ণভামিনী, পূর্ণকুমারী, বেদনাদাসী, সরলাবাই, মোন্তা ঘোষ, কে মল্লিক, বলাইদাশ শীল, সত্যভূষণ গুপ্ত, মিস আঙ্গুরবালা, হরেন্দ্রনাথ দত্ত, দ্বিজেন্দ্রনাথ বাগচী, গোপেশ্বর বন্দ্যোপাধ্যায়, ব্রজেন্দ্রলাল গাংগুলী, জিতেন্দ্রনাথ দত্ত,  আশ্চর্যময়ী দাসী রাধিকাপ্রসাদ গোস্বামী প্রমুখেরা।  

সেই সময়ে লখনৌ, আগ্রা, বেনারস, গোয়ালিয়র ইত্যাদি অঞ্চল থেকে পেশাদার বাইজি, নানা ঘরানার সুররসিক এবং বাদ্যযন্ত্রীরা দলে দলে কলকাতায় এসেছিলেন। তাদের ঘরানা এবং গানের ধারা বাংলা গানের উপর প্রভাব বিস্তার করেছিল। একসময়ে কলকাতা হয়ে উঠল মার্গ সংগীত ও বাঈ-নাচের চর্চার মূল কেন্দ্র । বাঙ্গালী বাই, বাবু, কালোয়াতি চর্চাকারী, ওস্তাদের মুখে উঠে এসেছিল রবীন্দ্রনাথের গান। তাদের কণ্ঠে রবীন্দ্রনাথের গানে দেখা দিল কালোয়াতি ঢং, সরগম, তান কর্তব, পুকার দম ইত্যাদির ব্যবহার। ফলে রবীন্দ্রনাথের গানের বাণী ও সুরের নিজস্ব চেহারা গেল বদলিয়ে। গায়ক-গায়িকারা তাদের নিজস্ব গায়ন রীতিকে প্রাধান্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথের গান পরিবেশন করতে শুরু করলেন।

সেই সময় রবীন্দ্রনাথের গানকে বলা হত ‘‌রবিবাবুর গান’‌। দুঃখের বিষয় উপরিউক্ত শিল্পীরা  কেউই রবীন্দ্রনাথের গানের বাণী বা সুরকে মর্যদা দেন নি।  তারা রবীন্দ্রনাথের গান গেয়েছেন নিজেদের খুশিমত সুরে, গানের কথাও বদলিয়ে দিয়েছেন নিজেদের মত করে। আসলে তখন গানের সঠিক মুদ্রিত পাঠ এবং স্বরলিপির অভাব ছিল। ছিল না গান গাইবার উপযুক্ত প্রশিক্ষণ, অনুশাসন বা বাদ্ধবাধকতা। সেইজন্য তখনকার রবীন্দ্রসংগীতগুলিতে রাবীন্দ্রিক-সৌন্দর্যের অভাব রয়েছে। আসলে তখনও রবীন্দ্রনাথের গানগুলি ‘রবীন্দ্রসংগীত’ হয়ে ওঠেনি। রেকর্ড-লেবেলে গীতিকার-সুরকার হিসাবে রবীন্দ্রনাথের নামের উল্লেখ থাকত না। গানের পাশে কেবল উল্লেখ থাকত কেবল রাগরাগিণীর নামটাই । রেকর্ডে রবীন্দ্রনাথের নাম ছাপা শুরু হয় ১৯২৫ সাল থেকে। 

রবীন্দ্রনাথের গানের যথেচ্ছাচারের দুএকটি নমুনা এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে।

দ্বিজেন্দ্রনাথ বাগচি ১৯০৪ সালে রবীন্দ্রনাথের লেখা ‘কেন যামিনী না যেত জাগালে না ’ গানটি রেকর্ড করেন। অনেকে মনে করেন এটিই রবীন্দ্রনাথের গানের প্রথম রেকর্ড। দ্বিজেন্দ্রনাথ গানটিকে সম্পূর্ণ নিজের ঢং-এ গেয়েছেন। গান শুরু করেছেন ‘যামিনী না যেতে জাগালে না কেন’ দিয়ে, একটি স্তবক  সম্পূর্ণ বাদ দিয়েছেন, গানের কথার যথেষ্ট পরিবর্তন করেছেন এমনকি স্বরলিপিও অনুসরণ করেন নি।

দ্বিজেন্দ্রনাথ বাগচি

মূল গান কেন যামিনী না যেতে জাগালে না । শিল্পী হেমন্ত মুখোপাধ্যায় । রেকর্ড ১৯৫৫ সাল

হেমন্ত মুখোপাধ্যায়

আর একটি নমুনা। একই বছরে (১৯০৫) পূর্ণকুমারী দাসী ‘আমি চিনি গো চিনি’ গানটি  রেকর্ড করেছেন ‘তোমায় চিনি গো চিনি তোমারে ওগো বিদেশিনী’ দিয়ে শুরু করে। প্রথম ছত্রের পরিবর্তন ছাড়াও গানের অনেক শব্দও অদলবদল করেছেন। মূল গানটির ঝিঁঝিঁট পূর্ণকুমারী গেয়েছেন সিন্ধু রাগে।

মূল গান আমি চিনি গো চিনি তোমারে। শিল্পী সুচিত্রা মিত্র । রেকর্ড ১৯৮৬ সাল

এছাড়া ১৯০৫ সালে মানদাসুন্দরীর ‘মাঝে মাঝে তব দেখা পাই’, ১৯০৬-এ বেদনা দাসীর ‘আজ তোমারে দেখতে এলেম’, ১৯১০-এ  বলাইদাস শীলের ‘তোমারেই করিয়াছি জীবনের ধ্রুবতারা’, ১৯১১-য় ব্রজেন্দ্রলাল গাঙগুলির ‘তুমি কেমন করে গান কর’ ১৯১৪-য় সত্যভূষণ গুপ্তর ‘তুমি সন্ধ্যার মেঘমালা’ ১৯১৫-য়  রাধিকাপ্রসাদ গোস্বামীর ‘স্বপন যদি ভাঙ্গিল’, ১৯১৮-য় জিতেন্দ্রনাথ দত্তর ‘দেখা পেলাম ফাল্গুনে’, ১৯১৯-এ জিতেন্দ্রনাথ দাসের ‘একদা তুমি প্রিয়ে’, ১৯২০-তে কে মল্লিকের ‘আমার মাথা নত করে দাও’, ১৯২১-এ আশ্চর্যময়ী দাসীর ‘ওই বুঝি বাঁশি বাজে’, ১৯২২-এ মান্তা ঘোষের ‘আজি এ আমার হৃদয় দুয়ার’ ইত্যাদি কথা-সুর-পরিবেশনার স্বেচ্ছাচারিতা রবীন্দ্রসংগীত-জগতে এক অরাজকতা সৃষ্টি করেছিল।

নিজের গানের এই বিকৃতি ও স্বেচ্ছাচারিতা রবীন্দ্রনাথেকে ক্ষুণ্য করেছিল। কিন্তু কোনো কপিরাইটের বাধা না থাকায় তার কিছু করবারও ছিলনা, এমনকি কোনো রয়্যালটিও তিনি পেতেন না। ১০ মার্চ ১৯১৫ কবির সলিসিটর খগেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় কবির রচিত গানের  ‌রয়্যালটি দাবি করে গ্রামোফোন কোম্পানিকে চিঠি দেন। গ্রামোফোন কোম্পানী কবিকে গীতিকারের ‌রয়্যালটি দিতে রাজি হলেন। ভারতবর্ষে রবীন্দ্রনাথই সর্বপ্রথম গীতিকার হিসেবে ‌রয়্যালটি পেয়েছেন। 

এই স্বেচ্ছাচারিতার মধ্যেও  দিনেন্দ্রনাথ, অমলা দাশ, সাহানা দেবী, রমা মজুমদার, সুরেন্দ্রনাথ মৈত্র, কনক দাস, মনিকা দেবী প্রমুখ কিছু শিল্পী রবীন্দ্রনাথের তত্ত্বাবধানে গানের আশ্রমিক চেহারার রূপটি ধরে রাখবার চেষ্টা করে গিয়েছেন। কিন্তু অন্যান্য শিল্পীদের রেকর্ডে তাঁর গানের পরিবেশনায় ইচ্ছেমতো প্রয়োগ ব্যবহার বন্ধ হল না, বরং তা আরও আপত্তিজনক মাত্রায় পৌঁছোয়।

অবশেষে কবি ১৯২৬ সালে আইনের সাহায্য নিতে বাধ্য হলেন।  ১৯২৬ সালের ৫ই অক্টোবর, গ্রামোফোন কোম্পানী ও কবির মধ্যে একটি চুক্তি সাক্ষরিত হয়। যার ফলে যেকোনো রবীন্দ্রসংগীত রেকর্ড করতে হলে কবির অনুমোদন বাধ্যতামূলক করা হল। শিল্পীরা তাদের গান রবীন্দ্রনাথের কাছে পাঠাতেন। সেটি শুনে তিনি সম্মতি দিলে তবেই তা বানিজ্যিকভাবে রেকর্ড হয়ে বেরত। এই চুক্তির ফলে স্বেচ্ছাচারিতা, কালোয়াতি ঢঙে গাওয়া মায়ফিলের চেহারা থেকে মুক্ত হয়ে রবীন্দ্রনাথের গানের প্রকৃত চেহারাটি আমাদের কাছে ধরা দিল।

তখনও ‘রবীন্দ্রসংগীত’ কথাটি প্রচলিত হয়নি। এর প্রথম ব্যবহার সম্বন্ধে একাধিক মতবাদ রয়েছে। ১৯৩১ সালের ২৭ ডিসেম্বর রবীন্দ্রনাথের সত্তর বছরপূর্তি উপলক্ষে ‘‌রবীন্দ্রপরিচয় সভার উদ্যোগে ‘‌জয়ন্তী-উৎসর্গ’‌ নামে একটি সঙ্কলনগ্রন্থ প্রকাশ করা হয়।সেই সঙ্কলনে ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ‘‌রবীন্দ্রনাথের সংগীত’‌ বিষয়ে একটি নিবন্ধে লেখেন। সেই নিবন্ধে ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ‘ রবীন্দ্রসংগীত’‌ শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেছিলেন।

অন্যদিকে বলা হয় গ্রামোফোন রেকর্ডের মাধ্যমেই ‘‌রবীন্দ্রসংগীত’‌ আখ্যাটি সর্বজনগ্রাহ্য হয়েছে। জানুয়ারি, ১৯৩৫ ‌ কনক দাসের একটি রেকর্ড পরিচিতিতে সম্ভবত প্রথম ‘‌‌রবীন্দ্রসংগীত’‌ কথাটি লেখা হয়েছিল। (‌রেকর্ডনং পি১১৭৯২ ‌ ‘‌মনে রবে কিনা রবে আমারে’‌/‘‌কাছে যবে ছিল পাশে হল না যাওয়া’‌)। ‘‌‌রবীন্দ্রসংগীত’ নামের এই শব্দটির জন্য সমস্ত বাঙ্গালী গ্রামোফোন কোম্পানীর কাছে চিরঋণী হয়ে থাকবে। কারণ তারাই তাদের রেকর্ড-তালিকায়, রেডিওতে এবং নানা অনুষ্ঠানে  ‘‌‌রবীন্দ্রসংগীত’ কথাটিকে বারবার ব্যবহার করেছে, এবং তা মানুষের মনে স্থায়ী জায়গা করে দিয়েছে।

১৯২৬ সালে গ্রামোফোন কোম্পানীর সঙ্গের বীন্দ্রনাথের চুক্তির আগে প্রকাশিত রেকর্ডের গায়ক-গায়িকারা কেউই রবীন্দ্রপরিমণ্ডলের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না।কেবলমাত্র অমলা দাস এবং সুরেন্দ্রনাথ মৈত্রই রবীন্দ্রনাথের কাছে সংগীত-শিক্ষা পেয়েছিলেন। কিন্তু  ১৯২৬ থেকে ১৯৩৫ (গ্রামোফোন রেকর্ড) এবং ১৯৩৬ থেকে ১৯৪১ (হিন্দুস্থান রেকর্ড) সালের মধ্যে প্রকৃত শিক্ষাপ্রাপ্ত বহু শিল্পীর গাওয়া অসংখ্য রেকর্ড প্রকাশিত হয়।এই পর্বের রবীন্দ্রপরিমণ্ডল-ভুক্ত বিশেষ শিল্পী গোষ্ঠী হিসাবে আত্মপ্রকাশ ঘটে অমলাদাস, অমিতাঠাকুর, কণিকা মুখোপাধ্যায়, অমিয়া ঠাকুর, সাহানা দেবী, মালতীদেবী, শান্তিদেব ঘোষ, দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রমুখ শিল্পীদের। রবীন্দ্রনাথ ছাড়াও দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে তারা নিবিড় প্রশিক্ষণ পেয়েছিলেন। উল্লেখ করা যায় ১৯৩৬ থেকে ১৯৪১ পর্যন্ত প্রকাশিত রবীন্দ্রসংগীতের সমস্ত রেকর্ড রবীন্দ্রনাথের অনুমোদনের পরে দিনের আলো দেখেছিল।

পরবর্তী পর্বে কৃষ্ণচন্দ্র দে, মেনকা ঠাকুর, ধীরেন দাস, সন্তোষ সেনগুপ্ত, পঙ্কজকুমার মল্লিক, রাধারানী দেবী, কানন দেবী এবং তারও পরে দেবব্রত বিশ্বাস, গীতা নাহা, সুবিনয় রায়, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, সুচিত্রা মিত্র, রাজ্যেশ্বরী দত্ত, অসিত বরন প্রমুখ উজ্জ্বল তারকাদের কণ্ঠের শ্রুতিমধুর গানগুলি সমস্ত সংগীতপ্রেমীর কাছে রবীন্দ্রসংগীতের জনপ্রিয়তাকে সীমাহীন উচ্চতায় পৌঁছিয়ে দিয়েছে।

ডা. পূর্ণেন্দুবিকাশ সরকার

 

6 Responses

  1. এই লেখা পড়তে বসে ছোটোবেলায় কলকাতা দূরদর্শনে দেখা একটা অনুষ্ঠানের কথা আজ মনে পড়ে যাচ্ছে।সম্ভবত কবিকন্ঠ বলে ঘন্টা খানেকের অনুষ্ঠানটি কবিগুরুর জন্মদিনে প্রচারিত হয়েছিল।আমার খুব ভালো লেগেছিল সেই অনুষ্ঠানটি যা এখনো মনে আছে। বর্তমান প্রজন্মের কাছে এই বিষয়গুলি আজ খুব বেশি করে জানানোর প্রয়োজনীয়তা আছে বোধ করি।আমার অন্যতম ভালো লাগার বিষয় নিয়ে লেখার জন্যে শ্রদ্ধেয় ডাক্তার সরকারকে প্রণাম এবং কৃতজ্ঞতা জানাই।

    1. অমিতাভ সরকার শনিবারের বারের ব্লগের একনিষ্ঠ পাঠক ও শুভাকাংখী। আজকের লেখার প্রেক্ষিতে তার মন্তব্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ । ধন্যবাদ অমিতাভ।

  2. অত্যন্ত তথ্যসমৃদ্ধ একটি রচনা। কত কি জানতে পারলাম। প্রযুক্তির বিষয়টি খুব সুন্দরভাবে এনেছেন। শিল্পসৃষ্টির পরম্পরা অনুসারী হয়ে কেমন করে তা সাংস্কৃতিক যাপনের সঙ্গী হয়ে গেল, জেনে ঋদ্ধ হলাম। রেকর্ডিং ব্যাবস্থা করায়ত্ত না হলে, অনেক সম্পদই আমাদের অধরা থেকে যেত। সেই যুগের এ কাজের পথিকৃৎ মানুষগুলোকে প্রনাম। রবীন্দ্রনাথের গান নিয়ে স্বেচ্ছাচারিতা সেই আদিকাল থেকেই ছিল জেনে একটা কথা উপলব্ধি হয়, জাতি হিসেবে আমরা বরাবরই চালাকির দ্বারা বাজিমাত করার চেষ্টা করে গেছি। রচনাকারের প্রতিভা, ভাবনার মৌলিকতাকে সম্মান না করে, তাঁর সৃষ্টিকে অসম্মান জানাতে সেকালের বঙ্গসন্তানরাও কিছু কম যাননি দেখলাম। একালের অনেক বদগুণই আমরা উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছি এটা বেশ বুঝলাম। তবে, মন্দের মতো ভালোকেও পেয়েছি, এটাই স্বস্তি। সর্বোপরি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দুরদৃষ্টিকে কুর্নিশ, তাঁর সৃষ্টি রক্ষার জন্য ভাগ্যিস কপিরাইটের আশ্রয় নিলেন তিনি। নাহলে, কি যে কান্ড করতো বঙ্গের স্বেচ্ছাচারী অপদার্থের দল !

    1. অজন্তা সিহা যথার্থই বলেছেন। শুধু প্রতিভার অস্বীকৃতিই নয় রবীন্দ্রনাথের মত সৃষ্টিশীল মানুষটিকে জীবনে কত যে অসম্মান আর উপেক্ষা সহ্য করতে হয়েছে ভাবলে বিস্মিত হতে হয়। আর তাঁকে নিয়ে বর্তমানে যা টানাপোড়েন চলছে, ‘রবীন্দ্রসংগীত’ আবার ‘রবিবাবুর গান’ না হয়ে যায় !

  3. Khub bhalo laglo ei tathyobohul rachonati pore. Purhe doordarshan e sri Partho ghosh er porichalonay. Robibabur Gaan shirshak anushthan e ei dhoroner bikrito surer Rabindrasangit shunechhi..
    Dr.Sarkar er tathyoguli amader sammriddho korchhe nissondehe..byabohrito chhobigulo bishesh arthobaho… Namoshkar janai…

  4. সুগবেষিত ও অত্যন্ত সুপাঠ্য!
    ভবিষ্যতে চলচিত্রে রবীন্দ্রসঙ্গীতের ব্যবহার নিয়ে নূতন কিছু জানবার আশায় রইলাম।
    শুভেচ্ছা জানাই

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *